সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন
Title :
ফেসবুক ইনকামের মোহে হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিকতা ও নৈতিকতা? বিয়ের পর অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ালেন অভিনেত্রী সায়মা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা, পুরোনো নেতৃত্বের ওপরই আস্থা বিএনপির অনলাইন ও এসএমএসে জানা যাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভয়েস অফ সিভিল রাইটস ফাউন্ডেশন ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির মাংস পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাসুদ রানা আকন সরকার, ভারত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কঠোর বার্তা দিলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জনগণের আস্থা রক্ষায় সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান মাসুদ রানা আকন (Masud Rana Akon) জীবনী- আজকের বার্তা বিডি

নৌকায় স্কুলযাত্রা: অবহেলিত এক জনপদের বাস্তবতা

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরের একটি ইউনিয়নের বাসিন্দা আমি। দূরত্ব শুনতে কম মনে হলেও বাস্তবতা যেন কয়েক যুগ পিছিয়ে থাকা এক জনপদের প্রতিচ্ছবি। নাজিরপুর উপজেলার ৩ নং দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নে বসবাস করে প্রতিদিন আমি উপলব্ধি করি—উন্নয়নের মানচিত্রে আমাদের অবস্থান কতটা অনিশ্চিত, কতটা উপেক্ষিত।

আমাদের এখানে রাস্তা বলতে কাদা-মাখা সরু মেঠোপথ, যা বর্ষা এলেই পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যায়। চারপাশের ছোট-বড় অসংখ্য খালই হয়ে উঠেছে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এই খালগুলোর বুক চিরে চলা নৌকাই আমাদের ভরসা—একই সঙ্গে বাহন, পথ এবং জীবনরেখা।

এই জনপদে সকালে ঘুম ভাঙে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। দেশের অন্য প্রান্তে যেখানে শিশুরা হেঁটে বা যানবাহনে করে স্কুলে যায়, সেখানে আমাদের শিশুরা বৈঠা হাতে নৌকায় ওঠে। তাদের ছোট ছোট হাতেই থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে শিক্ষার পথে যাত্রা।

নদীর ঢেউ, খালের স্রোত, কচুরিপানার স্তূপ—সবকিছুকে পেরিয়ে তাদের স্কুলে পৌঁছাতে হয়। অনেক সময় মাঝপথে নৌকা আটকে যায়, কখনো বই-খাতা ভিজে যায়, আবার কখনো দুর্ঘটনার শঙ্কা মাথায় নিয়েই এগিয়ে চলতে হয়। এটি কোনো গল্প নয়—এটাই আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

শীতকাল এলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কচুরিপানায় খাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে নৌকা চলাচল প্রায় থেমে যায়। তখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে স্কুলে যাওয়া স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষা তখন আর অধিকার থাকে না—একটি কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়।

পানি কিছুটা কমলে মেঠোপথ দেখা যায়, কিন্তু সেটাও স্বস্তির নয়। বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো আর কাদামাখা সরু পথ—প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জীবন হাতে নিয়ে চলার মতো। সামান্য ভুলেই ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আমাদের ইউনিয়নে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সেখানে পৌঁছানোর নিরাপদ কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক—সবাই একই দুর্ভোগের শিকার। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে মাঝপথেই ঝরে পড়ছে।

এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় হয়। যারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যায়, তারাই জানে এই পথ কতটা কঠিন, কতটা নির্মম। তারা আসলে একটি “নীরব যুদ্ধ” লড়েই নিজেদের গড়ে তোলে। আমি নিজেও সেই সংগ্রামী দলের একজন সাক্ষী।

আমার জীবনেও এমন বহু ঘটনা আছে, যা মনে পড়লে আজও ভারী হয়ে ওঠে বুক। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কচুরিপানায় খাল আটকে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। ক্ষুধার কষ্ট নিয়ে অন্ধকার নামার পর বাড়ি ফিরেছি বহুবার। আবার কলেজ ছুটির পরে রাত ৭টা–৮টা বেজে যেত, কারণ নদীতে নৌকা বা লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকত কচুরিপানার কারণে। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যেত, শুধু আমাদের অপেক্ষা চলত—প্রকৃতির কাছে অসহায় মানুষের মতো।

এই অঞ্চলের মানুষের জীবন নৌকার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে বাজার করা, চিকিৎসা নেওয়া, এমনকি জরুরি কাজেও পানিপথই ভরসা। এক প্রবীণ মানুষের কথায়, “আমাদের জীবন একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।” এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়—এটি আমাদের অস্তিত্বের নির্মম সত্য।

দেশ আজ উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে—মহাসড়ক, সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়নের আলো কি সত্যিই আমাদের মতো প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছাচ্ছে? নাকি আমরা এখনো সেই পুরোনো অন্ধকারেই পড়ে আছি?

একজন সচেতন নাগরিক ও এই জনপদের ভুক্তভোগী হিসেবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়—গ্রামের মানুষ কি আজীবন নৌকাকেই একমাত্র যানবাহন হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য থাকবে? শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব নয়? উন্নয়ন কি কেবল শহরের অলংকার হয়ে থাকবে, নাকি গ্রামবাংলার বিল-খালেও পৌঁছাবে?

একটি পাকা রাস্তা আমাদের কাছে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি হতে পারে শিক্ষার আলোকবর্তিকা, উন্নয়নের দুয়ার এবং একটি প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

এই জনপদের মানুষ বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষা কবে শেষ হবে—এই প্রশ্ন আজ আর শুধু প্রশ্ন নয়, এটি এক নীরব আর্তনাদ।

এই আর্তনাদ কি কেউ শুনবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews