প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
বুধবার (১৩ মে) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন। মূলত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা, সেবার মান উন্নয়ন এবং তাদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণ করতে এই সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মর্যাদা, সক্ষমতা ও অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এমন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন এবং নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পান।
সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বর্তমান পরিস্থিতি, সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির বিষয় তুলে ধরেন। এসব আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন।
তিনি বলেন, ভবন নির্মাণ নীতিমালায় হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, সরকারি ও বেসরকারি অফিসসহ সব ধরনের স্থাপনায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। ভবনের প্রবেশপথ, কক্ষের দরজা ও টয়লেট এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, নতুন ভবনের পাশাপাশি পুরোনো স্থাপনাগুলোতেও ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নারীদের জন্য চালুর পরিকল্পনায় থাকা ইলেকট্রিক বাসেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন অনেক সহজ হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনসংগ্রাম, সাফল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রচারাভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে এবং বৈষম্যমূলক মনোভাব কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এছাড়া সারা দেশে পরিচালিত প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোর কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশও দেন তিনি। শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেন।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রাথমিকভাবে দেশের ১০ জেলার ১০ উপজেলায় ‘শিশু স্বর্গ’ নামে একটি প্রকল্প চালু করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, খুব দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার দুলাল সভায় অংশ নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাস্তব পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে আরও মানবিক, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথ সুগম হবে।