পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার এ বছর নতুন দর নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে চামড়া সংরক্ষণ ও অপচয় রোধে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নতুন এই মূল্য ঘোষণা করেন। সভাটি মূলত কুরবানিকে ঘিরে চামড়া ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ এবং বাজার পরিস্থিতি সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়।
সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, রাজধানী ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের চামড়া শিল্পে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কুরবানির সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়, যা দেশের চামড়া শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই শিল্পকে সচল ও লাভজনক রাখতে সরকার আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কুরবানির পশুর চামড়া যাতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং অবহেলার কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য সরকার বিশেষভাবে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি অর্থায়নে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে। এই লবণ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর মাধ্যমে দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ পাবে এবং চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুরবানির সময় চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে বাজারমূল্য কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এ কারণে সময়মতো লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা চামড়া শিল্পের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, যদি সরকার ঘোষিত মূল্য কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের কুরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাবেন। পাশাপাশি চামড়া পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। কারণ অতীতে অনেক সময় চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় কিংবা যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়েছে অথবা সীমান্তপথে পাচার হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। তাই এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কুরবানির মৌসুমে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নতুন মূল্য নির্ধারণ এবং বিনামূল্যে লবণ বিতরণের উদ্যোগ চামড়া শিল্পকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কুরবানিকে ঘিরে চামড়া শিল্পের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে পরিচালনা করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। সবাই সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করলে চামড়ার অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে। এবারের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার চামড়া শিল্পকে আরও সুশৃঙ্খল ও লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে চায়, যাতে কুরবানির এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেশের উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।