সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
Title :
ফেসবুক ইনকামের মোহে হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিকতা ও নৈতিকতা? বিয়ের পর অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ালেন অভিনেত্রী সায়মা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা, পুরোনো নেতৃত্বের ওপরই আস্থা বিএনপির অনলাইন ও এসএমএসে জানা যাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভয়েস অফ সিভিল রাইটস ফাউন্ডেশন ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির মাংস পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাসুদ রানা আকন সরকার, ভারত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কঠোর বার্তা দিলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জনগণের আস্থা রক্ষায় সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান মাসুদ রানা আকন (Masud Rana Akon) জীবনী- আজকের বার্তা বিডি

ফেসবুক ইনকামের মোহে হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিকতা ও নৈতিকতা?

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে
মাসুদ রানা আকন

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানবজীবনকে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বিশেষ করে ফেসবুক এখন আর কেবল বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি বিশাল ডিজিটাল অর্থনীতির প্ল্যাটফর্মে। ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, লাইভ সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে হাজারো মানুষ আয় করছেন। অনেক তরুণ-তরুণী এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং নতুন ধরনের উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক বোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ডিজিটাল অর্থনীতির এই প্রসার কি সত্যিই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি অজান্তেই তৈরি করছে এক গভীর সামাজিক সংকট?

ফেসবুকভিত্তিক আয়ের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করা। আর এই মনোযোগ অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেকেই বেছে নিচ্ছেন সহজ কিন্তু ক্ষতিকর পথ। ভুয়া খবর, অতিরঞ্জিত তথ্য, ভিত্তিহীন গুজব কিংবা কৃত্রিম নাটকীয়তার মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। সত্যের চেয়ে চমক, দায়িত্বশীলতার চেয়ে ভাইরাল হওয়া যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। সামাজিক আস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও বিভাজনের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার মোহ বাস্তব সম্পর্কগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একসময় পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করতেন, সাংস্কৃতিক চর্চা করতেন কিংবা পারস্পরিক সময় ভাগাভাগি করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে অনলাইন ব্যস্ততা। পরিবারে বসে থাকা মানুষগুলো শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা সামাজিক বন্ধনের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে ফলোয়ার সংখ্যা, লাইক এবং শেয়ারের হিসাব।

একটি সমাজের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার নৈতিক ভিত্তির ওপর। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক সাফল্যের মোহে অনেকেই নৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম করতে দ্বিধা করছেন না। কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশ পড়াশোনার চেয়ে কনটেন্ট তৈরিতে বেশি সময় ব্যয় করছে। অনেক ক্ষেত্রে অশালীনতা, অশোভন আচরণ কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডকে বিনোদনের নামে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এমন আচরণও কখনো কখনো জনপ্রিয়তার কারণে প্রশংসিত হচ্ছে। এটি একটি ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংকেত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা ও চরিত্র গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান সময়ে আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো অপসংস্কৃতির বিস্তার। কৃত্রিম ঝগড়া, সাজানো নাটক, অরুচিকর হাস্যরস কিংবা ব্যক্তিগত অপমানকে কেন্দ্র করে তৈরি কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ এসব বিষয় সহজেই মানুষের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো মানুষের রুচিবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অর্থনৈতিক লাভের কারণে এই ধরনের কর্মকাণ্ড অনেক সময় নীরব সামাজিক স্বীকৃতিও পেয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুকভিত্তিক আয়ের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো ব্যক্তিগত জীবনের অতিরিক্ত প্রকাশ। পরিবারের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, ব্যক্তিগত আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত সংকটও অনেক সময় কনটেন্টে পরিণত হচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যখন দর্শকের বিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়, তখন সম্পর্কের গভীরতা ও পারস্পরিক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, যা মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে।

তবে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ফেসবুকের ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। অনেক শিক্ষক, লেখক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সমাজসেবী এই মাধ্যম ব্যবহার করে জ্ঞান, সচেতনতা এবং ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কনটেন্ট মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। অনেক তরুণ সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। অর্থাৎ সমস্যা ফেসবুক নয়; সমস্যা হলো এর দায়িত্বহীন ও অনৈতিক ব্যবহার।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং তাদের বাস্তব জীবনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, গণমাধ্যম সচেতনতা এবং নৈতিক শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অর্থনৈতিক সাফল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কখনোই মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের বিকল্প হতে পারে না। যে উন্নয়ন মানুষের চরিত্রকে দুর্বল করে, সামাজিক বন্ধনকে ভেঙে দেয় এবং মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই প্রয়োজন প্রযুক্তির সুফল গ্রহণের পাশাপাশি তার অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকা।

ফেসবুক ইনকাম বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কল্যাণকর শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে নৈতিকতা ও মানবিকতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় অর্থের ঝলকানির আড়ালে আমরা হারিয়ে ফেলব আমাদের সামাজিক সংহতি, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক মূল্যবোধের অমূল্য সম্পদ। সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে এবং অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি নৈতিক সমৃদ্ধিও নিশ্চিত হবে।

 

মাসুদ রানা আকন

লেখক ও সাহিত্যিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews